ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে ফতুল্লা অঞ্চল নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা আর পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ভোটের মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার শ্রমিক কলোনি-সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই। কে হচ্ছেন এবারের কান্ডারি! গত কয়েক দশকের সমীকরণ পাল্টে দিয়ে এবার ভোটের মাঠে দেখা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস।
ফতুল্লার এই আসনটি বরাবরই প্রভাবশালী প্রার্থীদের দখলে থাকে। তবে এবারের নির্বাচনে লড়াইটা কেবল পেশি শক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রূপ নিয়েছে জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে। প্রধান দলগুলোর প্রার্থীদের পাশাপাশি হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি পাল্টে দিয়েছে সাধারণ হিসাব-নিকাশ। বিএনপির জোটের প্রার্থীর বাইরেও এই আসনে সাবেক তিনজন নেতা ভোটের মাঠে সক্রিয়। এছাড়া, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীও এ আসনের বেশ আলোচনায় রয়েছেন।
ইতিপূর্বের নির্বাচনেও এই আসনটি ছিল আলোচিত। বিগত সময়ে হেভিওয়েট নেতারাই এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে চারবার সংসদ সদস্য ছিলেন একেএম শামীম ওসমান। এছাড়াও বিএনপিরও দুই হেভিওয়েট নেতা আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩২৭ জন। এই আসনে ১৫ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষিত হয়েছে। তবে ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন পাঁচ প্রার্থী । তারা হলেন- জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মনির হোসাইন কাসেমী, বিএনপি’র সাবেক দুই সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও গিয়াসউদ্দিন, বিএনপি নেতা মো. শাহ আলম ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমী ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু এবার মনির কাসেমী নিজ দলের প্রতীক খেঁজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করছেন। ইসলামী ঘরানায় তার অবস্থান গতবারের তুলনায় বেশ শক্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপি জোটের হলেও তাকে বিএনপিরই সাবেক তিনজন নেতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। বিএনপির এই নেতা আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং দলের নির্বাহী কমিটিরও সদস্য ছিলেন। কিন্তু আসনটিতে তিনি জোটের প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তিনি ২০০১ সালে আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর তালিকায় আরও রয়েছে আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী শাহ আলম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তিনিও দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। শাহ আলমও নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশায় ব্যবসায়ী এই প্রার্থীর ফতুল্লা অঞ্চলে বেশ প্রভাব রয়েছে। দলীয় নেতাদের একটি বড় অংশ তার পক্ষে কাজ করছে। এছাড়াও এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন ‘কিং মেকার’ খ্যাত বিএনপি সাবেক নেতা মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সহ-সভাপতি। ১৯৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি’র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনীতির মাঠে কৌশলী ভূমিকার কারণে তিনি ‘কিং মেকার’ খ্যাতি পেয়েছিলেন।
বিএনপি ও জোটের এই চার প্রার্থীর পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন। তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। ইতোমধ্যে তরুণ ভোটারদের বেশ সমথর্ন পাচ্ছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের এই আসনে হেভিওয়েট একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোটারও বিভক্ত হয়েছে একাধিক মেরুতে। ফতুল্লার কুতুবপুরের পোশাক শ্রমিক নয়ন বলেন, আমরা শান্তি চাই। যিনি আমাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবেন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন, ভোটটা তাকেই দেব।
ফতুল্লার ব্যবসায়ী জুয়েল জানান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সবই হাই-প্রোফাইল প্রার্থী। মনে হচ্ছে এবার ভোট হবে খুব অল্প ব্যবধানে। কিন্তু এই এলাকা বহুদিন ধরে অবহেলিত। আমরা চাই যোগ্য প্রার্থী আসুক, আমাদের এলাকার উন্নয়ন হোক।
ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এই নির্বাচনি লড়াই কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক বড় পরীক্ষা। প্রার্থীরা এখন পাড়া-মহল্লায় উঠান বৈঠক আর পথসভায় ব্যস্ত। হাড্ডাহাড্ডি এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার গলায় জয়ের মালা পরবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
এদিকে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. রায়হান কবির জেলায় সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রত্যাশা দিয়ে বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও শতভাগ নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসন বদ্ধ পরিকর। ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত ও উৎসাহিত করার লক্ষে প্রশাসন কাজ করছে। ভোট কেন্দ্রে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত থাকবে। ভোট কেন্দ্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।